মাত্র কয়েক সেকেন্ডের হালকা কম্পন৷ তার উত্‍‌সও কয়েকশো কিলোমিটার দূরে৷ তাতেই কেঁপে উঠল ঢাকাবাসী৷ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আজ বুধবার সকাল ৮টা ২১ মিনিটে ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর ভূমিকম্পের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৬।

চিত্রঃ সাম্প্রতিক আসাম ভূমিকম্প লোকেশন

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ঢাকা থেকে ৩৯৭ কিলোমিটার দূরে আসামে। ভারতের আসামে ৬.২ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। সিলেট থেকে ভূমিকম্প স্থলের দূরত্ব প্রায় ৩৬৮ কিলোমিটার। পঞ্চগড় ,সিলেট এ ভূমিকম্পের তীব্রতা বেশী অনুভূত হয়, ভূমিকম্পে হঠাৎ মাটি ও ঘর-বাড়ি কেঁপে ওঠে। এছাড়া ঢাকা সহ অন্যান্য আশেপাশের জেলায় অনুভূত হয় ভূমিকম্প। এটা আমাদের জন্যে একটা বিশাল সতর্কবার্তা।

default
ভারতের আসামে ৬.২ মাত্রার ভূমিকম্প

কয়েক বছর আগেই নেপালের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের কথা আমাদের সবারই জানা৷ বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভূকম্প-প্রবণ এলাকার মধ্যেই অবস্থিত। আগামী দিনে ঢাকা যে বিধ্বংসী ভূমিকম্পের কবলে পড়বে না , তার কোনও নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না ভূ-বিজ্ঞানীরাও৷
আর যদি ভূমিকম্পের কবলে পড়ে তাহলে ঢাকার পরিণতি কি হবে , তা কম-বেশী সবাই অনুমান করতে পারি ৷ কিন্ত্ত তা নিয়ে এতটুকু চিন্তা নেই শহরবাসীর বা শহরের ভবন মালিকদের৷
ঢাকা সহ প্রধান শহরগুলো তে দশ তলা , আট তলা , ছ’তলা , পাঁচ তলা , চার তলা বাড়ির সংখ্যা হু -হু করেই বাড়ছে৷ কিন্তু এই ধরনের বহুতল ভূমিকম্পের সময় কতটা নিরাপদ ?


আমাদের দেশে যে সব বাড়ি তৈরি হচ্ছে তার সিংহভাগই ভূমিকম্প মোকাবিলায় অপারগ৷ ভবন মালিকরা অনেকটা বিশ্বাসের উপর ভর করেই বাড়ি তৈরি করছেন৷। বর্তমানে কোনও বাড়ি করতে হলে বিল্ডিং প্ল্যানের অনুমোদন দেওয়ার সময় ‘সিসমিক ফোর্স’ যাচাই করা হয়৷ অর্থাৎ, সেটি ভূমিকম্প প্রতিরোধ করতে পারবে কি না , তা খতিয়ে দেখা হয়৷ তবে সিসমিক ফোর্স মেনে বাড়ি তৈরি হচ্ছে কি না । আর তা দেখার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশন, বিভিন্ন বিভাগের উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, উপজেলা, পৌরসভা সহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার দায়িত্বরত ইঞ্জিনিয়ারদের৷ তাঁরাই হলেন এসব অথোরিটির চোখ -কান৷ কিন্তু এ ব্যাপারে এসব প্রতিষ্ঠানের তেমন কোন নিজস্ব নজরদারি ব্যবস্থা নেই এসব সরকারি সংস্থার। একইসাথে ভবন মালিকদের অনিহার কারনে , যত্রতত্র ডিজাইন ছাড়াই গড়ে উঠছে ভবন। এটা যে কতটা বিপদের দিকে আমাদের কে নিয়ে যাচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

অপরিকল্পিত ঢাকা, ছবিঃ ডেইলি স্টার

” ভবন মালিকরা ডিজাইন করিয়ে ইঞ্জিনিয়ারকে টাকা দেওয়াটা কে মনে করেন অনর্থক টাকা খরচ। ভূমিকম্প প্রতিরোধক ব্যবস্থা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মনোভাব অনেকটা এরকম যে ভূমিকম্প না হলে তা কোনও কাজেই আসবে না৷ টাকা খরচ করে ভূমিকম্প প্রতিরোধক বাড়ি বানানো । এজন্যই অনেকে খরচের ঝুঁকি নিতে চান না৷ ” কিন্ত সাইসমিক ফোর্স এর জন্য ডিজাইন না করে বাড়ি নির্মান করা হলে, যদি ভূ-কম্পনের মাত্রা (৪ .৫ -৫ রিখটার স্কেল বা তার বেশি ) হয় তাহলে এই ধরনের বাড়িও মোটেই নিরাপদ নয়৷


নতুন ভাবে গেজেট হওয়া বিএনবিসিতে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গাইডলাইন অনেকটাই বদলানো হয়েছে৷ ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা বিচার করে আগে গোটা দেশকে ৩ টা জোনে ভাগ করা হত৷ এখন সেটা চারটে জোনে ভাগ করা হয়৷ নিয়ম অনুসারে , যে কোনও বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রেই সাইসমিক জোন অনুসারে সাইসমিকফোর্স বিচার করে ভবনের ডিজাইন করতে হবে৷ পুরোনো বাড়ি মেরামতের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি হয়েছে। কোড অনুযায়ী যেকোন ধরনের ভবন নির্মানের ক্ষেত্রে একজন দক্ষ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের মাধ্যমে ভবনের ডিজাইন এবং ডিটেইলিং করা লাগবে।

আবার যেসব ভবন নির্মানের ক্ষেত্রে কোন ধরনের সয়েল টেস্ট করা হচ্ছেনা , কিংবা ফাউন্ডেশন এর যথাযথ ডিজাইন করা হচ্ছেনা,  এই ধরনের বাড়িও নিরাপদ নয়৷ যে মাটির উপর বাড়ির স্ট্রাকচার দাঁড়িয়ে থাকবে , সেটাই যদি আপনি পরীক্ষা না করেন তাহলে ভবন অক্ষত থাকবে কি করে ??

এছাড়া যে ভাবে কার পার্কিং জোন রাখতে ফাঁকা কলামের উপর বাড়ি তৈরি হচ্ছে সেটা খুবই বিপজ্জনক৷ ভূমিকম্পের ফলে উপরের চাপ নিতে না পেরে এই ধরনের কংক্রিটের কলাম ভেঙ্গে যেতেই পারে৷ এছাড়াও ভূমিকম্প প্রবন এলাকায় ফ্ল্যাট প্লেট স্ল্যাব ব্যাবহার করলে সেটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ন হতে পারে।

আবার অনেকেই বাড়ি নির্মানের ক্ষেত্রে ব্যাবহার করে থাকেন নিম্নমানের নির্মান সামগ্রী। বাড়ি নির্মানের ক্ষেত্রে সঠিক মানদন্ডের নির্মান সামগ্রী ব্যাবহার করতে হবে,ব্যবহার করা রড কত সাইকেল লোড নিতে পারবে, তা পরীক্ষা করে নিতে হবে।

বাড়ছে বহুতল ভবন নির্মাণের প্রবণতা এতে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু যদি ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শ ব্যাতীত এবং নির্মানের সঠিক নিয়মনীতি অনুযায়ী বাড়ি নির্মাণ না করা হয় তবে তা হতে পারে খুবই বিপদজনক ।

একজন চিকিৎসকের পরামর্শ না নিলে হয়তো আপনার একার প্রান যেতে পারে কিন্তু একজন ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শ ছাড়া ভবন নির্মানের ফলে যদি ভবন ধ্বসে পড়ে তাহলে চলে যেতে পারে বহু প্রান ।

আমাদের উচিত একজন দক্ষ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের পরামর্শে, বিএনবিসি গাইডলাইন অনুসরন করে বাড়ি নির্মান করা , এবং অন্যকেও বিএনবিসি অনুসরন করে বাড়ি নির্মানে উৎসাহিত করা। এতে করে ভবন থাকবে নিরাপদ বেঁচে যাবে বহু প্রান এছাড়াও ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকাজে পরিকল্পনা ও শৃঙ্খলা থাকতে হবে। সেনাবাহিনী, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। প্রস্তুতি ঠিক থাকলে জীবন বাঁচানো ও ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।

AUTHOR: 
Engr.Towhidul Islam

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here